মেনু নির্বাচন করুন
ফাইল

উপজেলার ভৌগলিক প্রোফাইলঃ

উপজেলার ভৌগলিক প্রোফাইলঃ

এ উপজেলায় ১১৫টি মৌজা ও ১৪৩টি গ্রাম আছে। চারটি ইউনিয়ন নিয়ে উপজেলা গঠিত ইউনিয়নগুলো হলো- বুলাকীপুর, পালশা, সিংড়া ও ঘোড়াঘাট। ২০০৫ সালে ১৫ ফেব্রুয়ারী ঘোড়াঘাট ইউনিয়নের একটি পৌরসভা সৃষ্টি হয়েছে। ২০১১ সালে আদমশুমারী জরিপ মোতাবেক এ উপজেলার জনসংখ্যা ১,১৭,৭৪০ জন। তন্মধ্যে পুরুষ ৫৯.০০১ জন ও মহিলা৫৮,৭৩৯ জন। পরিবার (খানা) সংখ্যা ৩০,০৭৭। প্রতি বর্গ কিলোমিটারে লোক বসতি ৭৯২ জনের উর্ধ্বে। মোট জনসংখ্যার শতকরা ৭৫ ভাগ মুসলমান, ১৫ ভাগ উপজাতি বা আদিবাসী এবং অবশিষ্ট ১০ ভাগ হিন্দু ও খ্রিস্টান।

ভূ-প্রকৃতি ও আবহাওয়া

উপজেলার ভূ-প্রকৃতি তিন ধরণের। যথা- লালমাটি, পলি, এঁটেল ও দোঁয়াশ। উপজেলার চারটি ইউনিয়নের মধ্যে পালশার কিছু অংশ, ঘোড়াঘাটের অধিকাংশ এবং সিংড়া ইউনিয়নের কিছু অংশ লালমাটির দ্বারা গটিত। পালশার ৮০ ভাগ, বুলাকীপুর ও সিংড়ার বেশির ভাগ এবং ঘোড়াঘাটের কিছু অংশ এঁটেল দোয়াঁশ মাটি। বুলাকীপুর ও সিংড়া ইউনিয়নের ৪০ ভাগ এলাকা পলিমাটি দ্বারা গঠিত। লেভেল অনুযায়ী উঁচু ও মধ্যম জমির পরিমাণ বেশি। স্থানীয় ভাষায় লালমাটির এলাকা খিয়ার নামে অভিহিত। এ মাটিতে ধান, ভুট্টা, গম ভাল জন্মে। আবার করতোয়া নদীর পূর্ব তীর সংলগ্ন ভূমি এলাকা পলি নামে খ্যাত। এ মাটিতে ধান, পাট, গম কলাই ও বিভিন্ন সবজীর আবাদ হয়।

যোগাযোগ ব্যবস্থা

সড়ক পথই যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম। উপজেলায় সামান্য নদী পথ আছে। মোট রাস্তার দৈর্ঘ্য ৩৩০ কিঃ মিঃ। তন্মধ্যে পাকা রাস্তা ৭৮ কিঃ মিঃ, অর্ধ পাকা রাস্তা ১৯ কিঃমিঃ, কাঁচারাস্তা ২২৮ কিঃমিঃ। উপজেলা সদরের সাথে চার ইউনিয়নের সড়ক যোগাযোগ বিদ্যমান। পাকা রাস্তা হিসেবে গোবিন্দগঞ্জ-ঘোড়াঘাট-ফুলবাড়ী, ঘোড়াঘাট-হিলি, ঘোড়াঘাট-পাঁচবিবি ও ঘোড়াঘাট-পলাশবাড়ী পাকা রাস্তা উল্লেখযোগ্য। রাস্তাগুলো যোগাযোগের ক্ষেত্রে নবযুগের সূচনা করেছে। ঘোড়াঘাট করতোয়া নদীর উপর ১৯৯৬ সালে নির্মিত বেইলী ব্রিজটি ঘোড়াঘাট বাসীর  দীর্ঘ দিনের স্বপ্ন পূরণ করেছে। বর্তমানে উপজেলার সকল রাস্তায় কার, বাস, ট্রাক, টেম্পু, মোটরসাইকেল, সাইকেল, গরুরগাড়ি, রিক্সা, ভ্যান প্রকৃতি যানবাহন চলাচল করে। তবে গ্রামীণ কাঁচা রাস্তাগুলো বর্ষাকালে কর্দমাক্ত হয়। এতে চলাচলে বেশ অসুবিধা হয়। তারপরেও আগের চেয়ে উপজেলার যোগাযোগ ব্যবস্থা বেশ উন্নত। অনেক রাস্তার দু-ধারে নানা জাতের গাছের চারা রোপণ করার ফলে রাস্তায় ছায়া বৃদ্ধি ও শোভা বর্ধন করছে। 

কৃষি ও খাদ্য

এ উপজেলার অধিকাংশ অধিবাসী কৃষি কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। মোট জমির পরিমাণ ১৪,৮৭৪ হেক্টর। দু’ফসলী ১১,৩৬৩ হেক্টর, তিন ফসলী ৮৭৪ হেক্টর। বহু দিন আগে থেকেই এ উপজেলা ‘খাদ্য উদ্বৃত্ত এলাকা’ হিসেবে গণ্য। উপজেলার মোট পরিবারের ৮৫ ভাগ কৃষির উপর নির্ভরশীল। মোট জনসংখ্যার ৫ ভাগ ব্যবসা ও অন্য পেশায় যুক্ত। অবশিষ্ট ১০ ভাগ কৃষি মজুর পরিবার। এখানকার অধিবাসীদের প্রধান খাদ্য ভাত, এর পরেই আছে গমের রুটি। এছাড়াও মিষ্টি আলু ও অন্যান্য ফলমূল খেতে অভ্যস্থ সকলেই। তরকারী হিসেবে মাছ, গোশ্ত ও সবজী প্রেমী সকলেই। উপজেলার কিছু এলাকায় কলা চাষ হয়। সম্প্রতি ভূট্টার নিবিড় আবাদ হলেও তা খাদ্যের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার হয় না। উপজেলায় বেশ কয়েকটি মুরগীর খামার আছে। এছাড়াও গৃহস্থ্যবাড়িতে ঘরোয়াভাবে হাঁস-মুরগী পালন করা হয়।

পেশা ও কর্ম

সমাজে নানা পেশার লোক বাস করে। যিনি যে পেশা অবলম্বন করে জীবিকা নির্বাহ করে তিনি সেই পেশার পরিচিত হন। এখানকার বেশির ভাগ বাসিন্দা কৃষক, তারা জমি কর্ষণ করে উৎপাদিত ফসলে জীবিকা নির্বাহ করে। কৃষিকাজ ছাড়াও ছোট-বড় ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, চিকিৎসক, শিক্ষাবিদ, আইনজীবী, মেকার, ড্রাইভার, ভ্যান চালক, রিক্সাওয়ালা, জেলে, যুগী, কামার, কুমার, ময়রা, নাপিত, কুলি, কৃষাণ, শ্রমিক, রাজমিস্ত্রী, ফেরিওয়ালা, তেলি প্রভৃতি পেশাজীবীদের বিচরণ ও কর্ম লক্ষ্য করা যায়।

সমাজ ও পরিবার

উপজেলার বাসিন্দারা সমাজবদ্ধভাবে বসবাস করে। সমাজের নেতৃস্থনীয় ব্যক্তি বা মাতবর প্রত্যেক সমাজের নেতৃত্ব দেন। সমাজবদ্ধভাবে বসবাসকারি বাসিন্দরা স্বাধিনভাবে নিজ নিজ ধর্ম-কর্ম সম্পাদন করে থাকে। এখানকার বেশিরভাগ বাসিন্দারা অভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে বসবাস করতে অভ্যস্থ। বিশেষ করে নবান্ন, পয়লা বৈশাখে ও গোছারপনা ইত্যাদি দেশজ সংস্কৃতিতে সকলেই যুক্ত হয়ে থাকে। আপদকালে এক অপরের সহযোগিতায় এগিয়ে যান। সমাজে মুসলমান, হিন্দু, খ্রিস্টান, ও আদিবাসীর বাস আছে। প্রত্যেক সম্প্রদায়ের বাসিন্দারা পরবারভুক্ত। পরিবারের কর্তা পিতা বা বায়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি যার নিয়ন্ত্রণে পরিবার পরিচালিত হয় এমন একজন ব্যক্তি। আগের দিনের প্রচলিত যৌথ পরিবার প্রথা উঠে গেছে, এখন একক পরিবার প্রথা চালু আছে। মাতৃতান্ত্রিক পরিবার অপেক্ষা পিতৃতান্ত্রিক পরিবারের সংখ্যা এখানে বেশি। উপজেলার মোট পরিবার (খানা) সংখ্যা ৩০,০৭৭ টি।  এ উপজেলায় ৪টি বিশিষ্ট্য পরিবারের পরিচয় পাওয়া যায় যেমন- বলাহার ও গোপালপুরের চৌধুরী পরিবার, কুলানন্দনপুরের সরকার পরিবার, রাণীগঞ্জের তালুকদার পরিবার ও ঘোড়াঘাটের সওদাগর পরিবার।

বসতবাড়ি

ইদানীং উপজেলা ও হাট-বাজার এলাকার কিছু কিছু পাকা ঘর তৈরি হচ্ছে। তারপরেও পাড়া গ্রামে বর্গাকার পদ্ধতিতে মাটির বাড়ি নিমার্ণের প্রবণতা অনেক আগে থেকেই আছে। সম্প্রতি সরকারিভাবে তৈরি গুচ্ছগ্রামসমূহ সারি পদ্ধতিতে নির্মিত। উপজেলার বিরাহিমপুর ও সাহেবগঞ্জ মৌজায় ২টি গুচ্ছগ্রাম আছে। পলি এলাকা অপেক্ষা খিয়ার এলাকার মাটি ঘর বেশি দিন টিকে। ২-৩ ফুট পুরু দেয়ালের ১০-১২ ফুট উঁচুতে কাঠের বরগার উপরের বাঁশের কাবারি বিছিয়ে কাদার প্রলেপ দিয়ে চাদ করা হয়। এটা এমন ভাবে তৈরি যার উপরে গৃহস্থালী দ্রব্যাদি রাখা যায়। গরমের মৌসুমে ঘর বেশ ঠান্ডা থাকে। ছাদের উপরেŠŠয়ারী টিনের কিংবা খড়ের চালা তোলা হয়।  সাধারণত থাকা ঘর এমন মজবুতভাবে তৈরি করা হয়। প্রত্যেক গৃহস্থের বাড়িতে কমপক্ষে পাক ঘরসহ ৪টি ঘর থাকে। কোন কোন গ্রামে ধনী গৃহস্থবাড়িতে মাটির দোতলা ঘরও আছে। গৃহস্থ বাড়ির বড় বৈশিষ্ট হলো প্রত্যেক বাড়ির সামনে খোলা উঠোন থাকে। এই উঠোনে গৃহস্থালী কাজ চলে। গরু-মহিষের খাদ্য খড়ের পালা বাড়ির বর্হিআঙ্গিনার একপাশে শোভা পায়। বসতবাড়ির আশেপাশে ফলজ বৃক্ষের ছায়াঘন বিনিড়তা লক্ষ্য করা যায়। বাড়ির চারপাশে মাটির প্রাচীর থাকে। এই প্রাচীরের উপরে খড়ের চালা থাকে। প্রাচীরগুলোতে প্রলেপ দিয়ে নিচের দিকে আলপনা টানা হয়। এতে বাড়ির সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায়। যাহোক, এখন পাকাঘর তৈরির প্রবণতা ক্রমে বাড়ছে। ২০০১ সালে উপজেলার বসতবাড়িতে বৈদ্যুতিক সংযোগের হার ছিল ২৯.৭২ % । (বিবিএস) 

অনেক গৃহস্থবাড়ির পাশে পুকুর আছে। এ সব পুকুরে গুরু মহিষের গোসল করানোসহ মাছের চাষ করা হয়। স্থানীয় মানুষের মাঝে গণসচেতনতা বৃদ্ধি পয়েছে। সেই সাথে অর্থনৈতিক উন্নতির হয়েছে অনেকের। যার পরিপ্রেক্ষিতে টেকসই আবাসগৃহ নিমার্ণে ধনিক শ্রেণীর লোকেরা বেশি তৎপর এখন। বিশেষ করে অনেক বাড়ির চারপাশে পাকা প্রাচীর নির্মাণ করায় চুরি রোধ করা অনেক ক্ষেত্রে সম্ভব হচ্ছে। যদিও গরু মহিষ চুরি একটি অনাকাংখিত ঘটনা।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য

শিক্ষাঃ ১৯৭১ সালের আগে এ উপজেলায় দু’চারটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছাড়া উল্লেখজনক কোন শিক্ষা প্রতিষ্টন ছিল না। অথচ মোগল আমলে উত্তরবঙ্গের রাজধানী হিসেবে ঘোড়াঘাট থেকেই শিক্ষার আলো ছড়িয়ে পড়েছিল চতুদিকে। ১৭৬৫ সালের পরে এ উপজেলার অনেক এলাকা বা গ্রাম জনমুন্য হয়ে পড়ে। কারণ , ইংরেজদের অত্যাচার বহু লোক অন্যস্থানে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিল। পরবর্তীতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে এলেও জনবসত গড়ে উঠতে বেশ বিলম্ব হয়। তাই শিক্ষার ক্ষেত্রে অন্যান্য উপজেলার চেয়ে এ উপজেলা অনেক পিছিয়ে ছিল। এখানকার শিক্ষার্থীরা দুরবর্তী জেলা শহর কিংবা অন্য কোন ভাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠিানে গিয়ে কষ্ট করে লেখা পড়া শিখতেন। বর্তমানে এ উপজেলায় কলেজ ৫টি, কারিগরী কলেজ ২টি, স্কুল এন্ড কলেজ ২টি, মাধ্যমিক বিদ্যালয় ১৭টি, মাদ্রাসা ১৪টি ও সরকারি, বে-সরকারী প্রাইমারী স্কুল ৫৮টি এবং কেজি স্কুল ০৯টি আছে। এ ছাড়াও বেশ কয়েকটি এনজিও স্কুল চালু রয়েছে। এইসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কারণে উপজেলার শিক্ষা হার আগের তুলনায় বেড়ে গেছে, নীচের দেখানো পরিসংখ্যান থেকেই তা বোঝা যাবে। পরিসংখ্যান বিভাগের তথ্য মতে ১৯৭৪ সালে উপজেলার শিক্ষার হার ছিল ১৮%, ১৯৮১ সালে ২১.৩%, ১৯৯১ সালে ২৬.১% এবং ২০০১ সালে ৩৯%।

স্বাস্থ্যঃ এখানকার আবহাওয়া মনোরম ও স্বাস্থ্যপ্রদ। তাই রোগ বালাই কম। সাধারণত জ্বর, সর্দি, কফ, কাশি, প্রধান রোগ। তবে ফাইলোরিয়া জাতীয় রোগ তথা গোদ, হারনিয়া, গলাফুলা এসব উপজেলায় হঠাৎ হঠাৎ দেখা যায়। অপুষ্টিজনিত রাতকানা রোগের প্রকোপ খুবই কম। ডায়েরিয়া, যক্ষ্মা, হাম বসন্ত ইত্যাদি রোগ দেখা দিলে নিকটস্থ থানা স্বাস্থকেন্দ্র কিংবা ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রের শরণাপন্ন হন রোগীরা। আধিনিক চিকিৎসা পদ্ধতির প্রচলন হলেও সনাতনী চিকিৎসা পদ্ধতি একেবারে উঠে যায়নি। জ্বীনে ধরা, ভূতে ধরা, মৃগী ইত্যাদি রোগে এখানো তাবিজ কবজ ও ঝাড় ফঁকের চর্চা আছে। এসব অপচিকিৎনা সাধারণত অশিক্ষিত লোকেরা বেশি গ্রহণ করে। জটিল অসুখ দেখা দিলে জেলা হাসপাতাল কিংবা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান রোগীরা। এ উপজেলায় ৩১ শয্যা বিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ছাড়াও ৪টি ইউপি স্বাস্থ্য কেন্দ্র এবং ১২টি স্যাটেলাই ক্লিনিক আছে। তাছাড়ও হাটে বাজারে এ্যালোপ্যাথ ও হোওিপ্যাথ অনেক ডাক্তার আছে। যাদের চিকিৎসায় ছোট খাটো রোগ নিরাময় হয়ে থাকে। উপজেলার ৮০ ভাগ বাড়িতে স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থা রয়েছে। পয়-ব্যবস্থাপনার হার ৪৫.৬৪%। নিরাপদ খাবার পানি ৯৪.২১%। এখানকার পানিতে আর্সেনিক আছে এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। তাই স্বাস্থ্য ব্যবস্থা অন্যান্য উপজেলার তুলনায় সন্তোষজনক।

শিল্প প্রতিষ্ঠানঃ

এ উপজেলায় কোন ভারি শিল্প প্রতিষ্ঠান নেই। এখানে শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলবার কোন চেষ্টা সরকারি বা বেসরকারিভাবে নেয়াও হয়নি। কয়েক বছর আগে ব্যক্তি বিশেষের উদ্যোগে এখানে একটি ছোট কাপড়ের কল প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সেটাও এখন বন্ধ। বর্তমানে যা আছে তা কুটির শিল্পের পর্যায়ভূক্ত। এই কুটির শিল্পগুলো স্থানীয় বাসিন্দাদের কিছু কিছু চাহিদা মিটিয়ে থাকে। বাংলা পিডিয়া থেকে জানা যায়, এ উপজেলায় ১০ জন স্বর্ণকার, ২০ ঘর কুমার, ৩০ জন কামার, ৪০টি ফার্নিচার দোকান ও ৫০ জন দরজী আছে। এছাড়াও বেশ ক’টি কাঠ ফাঁড়াই কল, ধানভাঙ্গা কল, চাতাল ও একাধিক ইটভাটি রয়েছে। এগুলোতে অনেক শ্রমিক কাজ করে। মধ্যযুগে এখানে নৌকা শিল্প গড়ে উঠেছিল।

খেলাধুলাঃ

 সনাতনী খেলার মধ্যে- হা-ডু-ডু, গোল্লাছুট, বৌ-ছিঃ ,কুৎকুৎ, দড়িখেলা, মার্বেলখেলা, কড়িখেলা, চেংকিপান্টু, নোনতা, কানামাছি, ষোলপ্যাত, কাউয়া কাক, দৌড়ঝাঁপ, পাতাখেলা, লাঠিখেলা, উল্লেখযোগ্য। জনপ্রিয় খেলার মধ্যে ফুটবল, ব্যাটমিন্টন, ভলিবল, কেরামবোর্ড, ক্রিকেট ইত্যাদি খেলার নাম করা যায়। ইদানীং সনাতন খেলা প্রায় উঠে গেছে। এখন আধুনিক খেলার প্রতি সব মানুষের দৃষ্টি। মূল ঘোড়াঘাটের চৌরাস্তা মোড়ের পশ্চিম ধারে বড় একটি ফুটবল খেলার মাঠ আছে। খেলোযাড়দের উন্নয়নের জন্য উপজেলায় একটি ক্রীড়া উন্নয়ন সংস্থা আছে। এই সংগঠনের উদ্যোগে উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়।

নদ-নদী ও জলাশয়

এ উপজেলায় মাত্র দুটি নদী আছে। একটি করতোয়া অন্যটি মইলা নদী বা মরা করতোয়া। নদী দুটির পরিচয় নিম্নরূপ-

করতোয়াঃ

 জনশ্রুতি আছে শিব-পাবর্তীর বিয়ের সময় হিমালয় জামাতার হাতে যে জল ঢেলে দিয়েছিলেন তা মাটিতে পড়ে একটি নদীর সৃষ্টি হয়। কার মানে হাত আর তোয়া মানে জল। এ থেকেই করতোয়া নামের উৎপত্তি। জনশ্রুতি যাই থাকুক, বাস্তবিকভাবে এ নদীর উৎপত্তি হয়েছে হিমালয় পর্বতের ঋহ্মবাম গ্রন্থি থেকে। তারপরে ভারতের জলাইগুড়ি জেলা হয়েবোংলাদেশের পঞ্চগড় জেলা সীমানায় প্রবেশ করেছে। অতঃপর ক্রমে দক্ষিণ দিকে বোদা, দেবীগঞ্জ, নীলফামারী দিয়ে বদরগঞ্জ ও নবাবগঞ্জের পূর্ব সীমানা স্পর্শ করে ঘোড়াঘাটে প্রবেশ করেছে। ঘোড়াঘাট দূর্গনগরীর পাশ দিয়ে চলে গেছে দক্ষিণে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কাঁটাখালি ব্রিজের স্থানে। ব্রিজের তল দিয়ে পূর্ব দিকে বাঙ্গালী হয়ে যমুনায় মিলিত হয়েছে। ১৭৮৭ সালের আগে এ নদীর প্রবাহ ছিল গোবিন্দগঞ্জের পশ্চিম পাশ দিয়ে দক্ষিণ দিকে।  অতঃপর মহাস্থানগড়ের পূর্বপাশ ঘেঁষে আরো দক্ষিণে সিরাজগঞ্জের হুড়াসাগর পর্যন্ত প্রবাহ চালু ছিল। ১৭৮৭ সালের পাহাড়ী ঢলে নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়ে কাটাখালি ব্রিজের তল দিয়ে প্রবাহিত হতে তাকে। দূর অতীতে এ  নদী ক-ল-তু নামে খ্যাত ছিল। তুর্কী আমলে এ নদী বেগমতি নামে খ্যাত ছিল। মোগল আমলে করতোয়া নামেই এর সমাধিক পরিচয় পাওয়া যায়। এ নদী যেমন প্রশস্ত ছিল তেমনি ছিল গভীর, আর ছিল প্রখর স্রোত। স্রোতের তীব্রতার কারণেই এ নদী দিয়ে ছোট ছোট নৌযান চলাচল করা কঠিন ছিল। পাল আমলে কৈবর্ত্য বা কর্বট জাতিরা এ নদীর তীরে বসবাস করতো। তারও আগে নিষাদ/কিরাত জাতির বাস ছিল। এ নদীর উভয় পাড়ে বিশেষ বিশেষ স্থানে অনেক বন্দর, মন্দির ও তীর্থস্থান গড়ে উঠেছিল অতীতে। সেগুলোর মধ্যে ঘোড়াঘাটের ঋষিঘাট মন্দির একটি। মোগল আমলে ঘোড়াঘাটে একটি প্রসিদ্ধ নদী বন্দর ছিল। যেখানে প্রত্যহ পণ্য বোঝাই শত শত নৌকা আসা যাওয়া করতো। মহাকালের পরিক্রমায় নদী এখন ক্ষীণকায়। নাব্যতা হারিয়ে এখন জলশূন্য। অনেক স্থানে সারা বছর পানি থাকে না। এখন ত্রিমোহনী ঘাটের দক্ষিণ দিকে একটি বেইলী ব্রিজ নির্মিত হয়েছে ১৯৯৬ সালে। তার উপর দিয়েই যানবাহন ও লোকজন চলাচল করে।

মইলা নদীঃ

এ নদীর উৎপত্তিস্থল পার্শ্ববতীৃ উপজেলা নবাবগঞ্জের আশুড়ার বিল। সেখান থেকে আঁকাবাঁকা পথে দক্ষিণ-পূর্ব  দিকে দাউদপুর হাটের উত্তর পাশ দিয়ে হেয়াতপুর, খোদাইপুর, মালদহ ও ঈশ্বরপুর মৌজার  মাঝ দিয়ে চেল গেছে দারিয়া। তারপরে আরো দক্ষিণে মোগরপাড়ার পাশ দিয়ে ঘোড়াঘাটের বুলাকীপুর ইউনিয়নে প্রবেশ করে। বলগাড়ীহাটের নিকট দিয়ে দক্ষিণ দিকে চলে গেছে। সাতপাড়া গড় স্পর্শ করে ঋষিঘাটের আগে বড় করতোয়ার সাথে মিলিত হয়েছে। এটা মরা করতোয়া নামেও পরিচিত। কথিত আছে এ নদী পথেই বেহুলা তার মৃত স্বামীকে উজানের দেবঘাটে (নবাবগঞ্জে) নিয়ে গিয়েছিলেন জীবন ফিরে পাওয়ার অভিলাষে। শেরউইলের মানচিত্রে এ নদী ‘কামদহ’ নামে উল্লেখিত হয়েছে। সিংড়া ইউনিয়নে এ নদীর তীরে (নদীর দক্ষিণ দিকে) সাতপাড়া মৌজায় একটি প্রাচীন দুর্গের চিহ্ন আছে। দুর্গটি কামরূপের রাজা নীলাম্বর তৈরি করেন বলে কোচবিহারের ইতিহাসে উল্লেখ আছে। সুলতানী আমলে দুর্গটি বারপাইকের গড় নামে খ্যাত হয়। প্রাচীন এ নদীতে এখন সারা বছর পানি থাকে না। বর্ষাকালে নদীটির দু’কুল ভরে ওঠে। দু-এক মাস পরেই আবার পানি শুকে যায়। এ নদীর তীরে গড়ে ওঠা ঋষিঘাট তীর্থ ক্ষেত্র বহুকাল আগে থেকেই হিন্দু নর-নারীদের নিকট পবিত্র। এই তীর্থস্থানে প্রতি বছর বারুনী স্নান হয়। এ উপলক্ষে এক দিনের জন্য মেলাও বসে। আশেপাশের হিন্দু নর-নারী ছাড়াও অন্যান্য সম্প্রদায়ের লোকেরাও মেলায় আসে। (জেলা গেজেটীয়ারঃদিনাজপুর-১৯৯১ সাল)। হালে স্নানঘাট ঘেঁষেই চারকোণী একচূড়া বিশিষ্ট্য প্রদক্ষিণ পথওয়ালা একটি মন্দির নির্মিত হয়েছে। এই মন্দির থেকে ২০০ গজ দক্ষিণ-পূর্ব দিকে আর একটি নির্মীয়মান মন্দির রয়েছে। দূর অতীতে এই মন্দির দুটি এলাকার দু’জন বড় ভূস্বামী নিমার্ণ করে দিয়েছিলেন।

পুকুর, দীঘি ও বিলঃ

উপজেলায় বেশ কিছু ছোট বড় দীঘি-পুকুর আছে। আগের দিনে জলাশয়ের পানি গৃহস্থালী কাজ, ফসল উৎপাদন ও মৎস্য চাষে ব্যবহৃত হতো। উপজেলার দীঘি- পুকুর গুলোর মধ্যে নয়নদীঘি, ছয়ঘাটি, বামনদীঘি, আন্ধেয়া দীঘি, পাঁচপুকুর, গোপালপুর ইছলা দীঘি, সাতন্যা নদা, দুপখরণ, ছোকপখরণ, সুখান পুকুর ধুসমারা, প্যাচাহার, নিতাসা প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। সরকারি তথ্য মতে এ উপজেলায় সরকারি ও বেসরকারি দীঘি-পুকুরের সংখ্যা ১০৫২টি। তন্মধ্যে সরকারী খাস পুকুর ১০৫টি আয়তন ১৯২ একর, বেসরকারি পুকুর ৪৮০টি আয়তন ২৪২ একর। উপজেলার লালদহ বিলের ( ১৮.৫৫ একর) অবস্থান এবং এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার দাবি রাখে। এ সব দীঘি, পুকুর ও বিলে প্রচুর মাছের চাষ হয়। অনেক দীঘিুপুকুর বা জলাশয় নিলাম ডাকের মাধ্যমে লীজ দেয়া হয়।

গাছপালা, ফসল ও ফল-মূল

গাছপালাঃউপজেলায় কোন বন নেই। সম্প্রতি সামান্য কিছু খাস জমি ও রাস্তার দু’ধারে বিভিন্ন জাতের গাছের চারা রোপণের কাজ চলছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রয়োজনে রোপিত বিভিন্ন জাতের গাছ ও উদ্ভিদ দেখতে পাওয়া যায়। এগুলোর মধ্যে বট, পাকুড়, কড়াই, তরুল, ঝাঁউ, পিতরাজ, ছাতিম, শিমু, আম, জাম, কাঁঠাল, বরই, কদম, বেল, বাবলা, নিম, তাল, সেগুন, আকশমনি, খোকশা, সুপারী, শশি, হেগণি, বাঁশ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। লতা জাতীয় ও ঔষধী উদ্ভিদের মধ্যে পান, পিঁপুল, গমভাদলি, ধুতুরা, সাপটি, তুলশী, কলমী, লজ্জাবতী, ওল, কচু, ঢোল, কলমি, ভূঁই, কুমড়া ও উলট কম্বল ইত্যাদি।

দেশী জাতের ধানঃ

আমন ধানের মধ্যে নীকুমর, শীল কুমর, বেঙ্গুন, নয়ারাজ, বাতরাজ ও শালি ধান প্রধান। আউশ ধানের মধ্যে দুধসর, সরসাপনা, ফরাশডাঙ্গা ও জলিধান। বোরো ধানের মধ্যে জটা, বিলো ও বাঙ্গাল ধাড়িয়া। এখন সাবেক ধানে পরিবর্তে নানা জাতের ইরি/বিরির চাষ হচ্ছে।

পশু, পাখি ও মাছ

        পশু- প্রাণীঃ  পশু মধ্যে গরু,মহিষ,ছাগল,ও ভেড়া প্রধান । এগুলো গৃহপালিত । এ ছাড়ও শিয়াল , কুকুর , বিড়াল,বেজি  গৃহস্থবাড়ির আশেপাশে এবং ঝোঁপঝাড়ে দেখতে পাওয়া যায়। আদিবাসীরা শুকর পালন করে ।শুধু তাই নয় ঘোড়ঘোটর বিভিন্ন গ্রামে আগে  ঘোড়ার  ব্যবহার ছিল ।এখন সাইকেলের প্রচলন হওয়ায় ঘোড়ার ব্যবহার উঠে গেছে।

পাখি:

         পাখির মধ্যে শকুন, চিল ,কাক,বাজ,পেঁচা,দোয়েল ঘুঘু, বক,কবুতর ,কোকিল, শালিক,বুলবুলি,মাছরাঙ্গা, শালিক,বুলবুলি,মাছরাঙ্গা,ফিঙে ,টুনটুনি, টিয়া, ডাহুক, কোঁড়াসাহ, বিভিন্ন প্রজাতির পাখি উপজেলার গাছপালায় ও মাঠেঘাটে বিচরন করতে দেখা যায়। এ ছাড়াও কবুতর ,হাস, মুরগী, প্রায় গৃহস্থের বাড়িতেই আছে।সম্প্রতি ছোট ছোট খামার করে বিদেশী মুরগী পালনের চেষ্টা চলছে। উপজেলায় ২০ টির উর্ধ্বে হাঁস মুরগীর ছোট খামার রয়েছে ।

মাছ:

মাছের মধ্যে রুই ,কাতলা, বোয়াল, শৌল ,গজার, চিতল, ভাংনা, কুরশা, দারকা, পুঁটি, চেলা,করতি, পাবদা, কৈ, মাগুর, শিং, খলসে, চোপড়া, টেংরা, চিংড়ি,গড়াই, গচি, ফলি, চ্যাং, চান্দা, কাকিলা, বাইম, বাউশ, রিটা, বাচা, ময়া, কর্তৃ, টেপা, ইত্যাদি মাছ এখানেকার নদ-নদী ও পুকুরে পাওয়া যায়।ইদানীং পুকুরে সিলভার কার্প ,গ্লাসকাপ,তেলাপিয়া, লাইলনটিকা,মুশা প্রভুতি মাছের প্রচুর চাষ হচ্ছে।

তথ্যসূত্র :

(১) জেলা পরিক্রমা দিনাজপুর :জেলা তথ্য অফিস দিনাজপুর থেকে প্রকাশিত,১৯৮৭-৮৮ ,পৃ,৬৯।

  1. আলবেরুনী ভারত তত্ত্ব : অনুবাদে-আবু মহামেদ হাবিবুল্ল ,বা/এ,ঢাকা -১৯৮২,পৃ.২০০।
  2. দেশী ধানের জাত : বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইন্সিটিটিউট-১৯৮২।


Share with :

Facebook Twitter