মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
ফাইল

নদ-নদী ও জলাশয়

এ উপজেলায় মাত্র দুটি নদী আছে। একটি করতোয়া অন্যটি মইলা নদী বা মরা করতোয়া। নদী দুটির পরিচয় নিম্নরূপ-

করতোয়াঃ

 জনশ্রুতি আছে শিব-পাবর্তীর বিয়ের সময় হিমালয় জামাতার হাতে যে জল ঢেলে দিয়েছিলেন তা মাটিতে পড়ে একটি নদীর সৃষ্টি হয়। কার মানে হাত আর তোয়া মানে জল। এ থেকেই করতোয়া নামের উৎপত্তি। জনশ্রুতি যাই থাকুক, বাস্তবিকভাবে এ নদীর উৎপত্তি হয়েছে হিমালয় পর্বতের ঋহ্মবাম গ্রন্থি থেকে। তারপরে ভারতের জলাইগুড়ি জেলা হয়েবোংলাদেশের পঞ্চগড় জেলা সীমানায় প্রবেশ করেছে। অতঃপর ক্রমে দক্ষিণ দিকে বোদা, দেবীগঞ্জ, নীলফামারী দিয়ে বদরগঞ্জ ও নবাবগঞ্জের পূর্ব সীমানা স্পর্শ করে ঘোড়াঘাটে প্রবেশ করেছে। ঘোড়াঘাট দূর্গনগরীর পাশ দিয়ে চলে গেছে দক্ষিণে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কাঁটাখালি ব্রিজের স্থানে। ব্রিজের তল দিয়ে পূর্ব দিকে বাঙ্গালী হয়ে যমুনায় মিলিত হয়েছে। ১৭৮৭ সালের আগে এ নদীর প্রবাহ ছিল গোবিন্দগঞ্জের পশ্চিম পাশ দিয়ে দক্ষিণ দিকে।  অতঃপর মহাস্থানগড়ের পূর্বপাশ ঘেঁষে আরো দক্ষিণে সিরাজগঞ্জের হুড়াসাগর পর্যন্ত প্রবাহ চালু ছিল। ১৭৮৭ সালের পাহাড়ী ঢলে নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়ে কাটাখালি ব্রিজের তল দিয়ে প্রবাহিত হতে তাকে। দূর অতীতে এ  নদী ক-ল-তু নামে খ্যাত ছিল। তুর্কী আমলে এ নদী বেগমতি নামে খ্যাত ছিল। মোগল আমলে করতোয়া নামেই এর সমাধিক পরিচয় পাওয়া যায়। এ নদী যেমন প্রশস্ত ছিল তেমনি ছিল গভীর, আর ছিল প্রখর স্রোত। স্রোতের তীব্রতার কারণেই এ নদী দিয়ে ছোট ছোট নৌযান চলাচল করা কঠিন ছিল। পাল আমলে কৈবর্ত্য বা কর্বট জাতিরা এ নদীর তীরে বসবাস করতো। তারও আগে নিষাদ/কিরাত জাতির বাস ছিল। এ নদীর উভয় পাড়ে বিশেষ বিশেষ স্থানে অনেক বন্দর, মন্দির ও তীর্থস্থান গড়ে উঠেছিল অতীতে। সেগুলোর মধ্যে ঘোড়াঘাটের ঋষিঘাট মন্দির একটি। মোগল আমলে ঘোড়াঘাটে একটি প্রসিদ্ধ নদী বন্দর ছিল। যেখানে প্রত্যহ পণ্য বোঝাই শত শত নৌকা আসা যাওয়া করতো। মহাকালের পরিক্রমায় নদী এখন ক্ষীণকায়। নাব্যতা হারিয়ে এখন জলশূন্য। অনেক স্থানে সারা বছর পানি থাকে না। এখন ত্রিমোহনী ঘাটের দক্ষিণ দিকে একটি বেইলী ব্রিজ নির্মিত হয়েছে ১৯৯৬ সালে। তার উপর দিয়েই যানবাহন ও লোকজন চলাচল করে।

মইলা নদীঃ

এ নদীর উৎপত্তিস্থল পার্শ্ববতীৃ উপজেলা নবাবগঞ্জের আশুড়ার বিল। সেখান থেকে আঁকাবাঁকা পথে দক্ষিণ-পূর্ব  দিকে দাউদপুর হাটের উত্তর পাশ দিয়ে হেয়াতপুর, খোদাইপুর, মালদহ ও ঈশ্বরপুর মৌজার  মাঝ দিয়ে চেল গেছে দারিয়া। তারপরে আরো দক্ষিণে মোগরপাড়ার পাশ দিয়ে ঘোড়াঘাটের বুলাকীপুর ইউনিয়নে প্রবেশ করে। বলগাড়ীহাটের নিকট দিয়ে দক্ষিণ দিকে চলে গেছে। সাতপাড়া গড় স্পর্শ করে ঋষিঘাটের আগে বড় করতোয়ার সাথে মিলিত হয়েছে। এটা মরা করতোয়া নামেও পরিচিত। কথিত আছে এ নদী পথেই বেহুলা তার মৃত স্বামীকে উজানের দেবঘাটে (নবাবগঞ্জে) নিয়ে গিয়েছিলেন জীবন ফিরে পাওয়ার অভিলাষে। শেরউইলের মানচিত্রে এ নদী ‘কামদহ’ নামে উলে­খিত হয়েছে। সিংড়া ইউনিয়নে এ নদীর তীরে (নদীর দক্ষিণ দিকে) সাতপাড়া মৌজায় একটি প্রাচীন দুর্গের চিহ্ন আছে। দুর্গটি কামরূপের রাজা নীলাম্বর তৈরি করেন বলে কোচবিহারের ইতিহাসে উলে­খ আছে। সুলতানী আমলে দুর্গটি বারপাইকের গড় নামে খ্যাত হয়। প্রাচীন এ নদীতে এখন সারা বছর পানি থাকে না। বর্ষাকালে নদীটির দু’কুল ভরে ওঠে। দু-এক মাস পরেই আবার পানি শুকে যায়। এ নদীর তীরে গড়ে ওঠা ঋষিঘাট তীর্থ ক্ষেত্র বহুকাল আগে থেকেই হিন্দু নর-নারীদের নিকট পবিত্র। এই তীর্থস্থানে প্রতি বছর বারুনী স্নান হয়। এ উপলক্ষে এক দিনের জন্য মেলাও বসে। আশেপাশের হিন্দু নর-নারী ছাড়াও অন্যান্য সম্প্রদায়ের লোকেরাও মেলায় আসে। (জেলা গেজেটীয়ারঃদিনাজপুর-১৯৯১ সাল)। হালে স্নানঘাট ঘেঁষেই চারকোণী একচূড়া বিশিষ্ট্য প্রদক্ষিণ পথওয়ালা একটি মন্দির নির্মিত হয়েছে। এই মন্দির থেকে ২০০ গজ দক্ষিণ-পূর্ব দিকে আর একটি নির্মীয়মান মন্দির রয়েছে। দূর অতীতে এই মন্দির দুটি এলাকার দু’জন বড় ভূস্বামী নিমার্ণ করে দিয়েছিলেন।

পুকুর, দীঘি ও বিলঃ

উপজেলায় বেশ কিছু ছোট বড় দীঘি-পুকুর আছে। আগের দিনে জলাশয়ের পানি গৃহস্থালী কাজ, ফসল উৎপাদন ও মৎস্য চাষে ব্যবহৃত হতো। উপজেলার দীঘি- পুকুর গুলোর মধ্যে নয়নদীঘি, ছয়ঘাটি, বামনদীঘি, আন্ধেয়া দীঘি, পাঁচপুকুর, গোপালপুর ইছলা দীঘি, সাতন্যা নদা, দুপখরণ, ছোকপখরণ, সুখান পুকুর ধুসমারা, প্যাচাহার, নিতাসা প্রভৃতি উলে­খযোগ্য। সরকারি তথ্য মতে এ উপজেলায় সরকারি ও বেসরকারি দীঘি-পুকুরের সংখ্যা ১০৫২টি। তন্মধ্যে সরকারী খাস পুকুর ১০৫টি আয়তন ১৯২ একর, বেসরকারি পুকুর ৪৮০টি আয়তন ২৪২ একর। উপজেলার লালদহ বিলের ( ১৮.৫৫ একর) অবস্থান এবং এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার দাবি রাখে। এ সব দীঘি, পুকুর ও বিলে প্রচুর মাছের চাষ হয়। অনেক দীঘিুপুকুর বা জলাশয় নিলাম ডাকের মাধ্যমে লীজ দেয়া হয়।