মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

উপজেলার ঐতিহ্য

ঐতিহাসিক স্থান ও প্রত্নপ্রাচুর্য

         ঘোড়াঘাট প্রাচীন জনপদ হওয়ায় এর বিভিন্ন স্থানে পুরাকীর্তি থাকা স্বাভাবিক ব্যাপার। এ উপজেলার ঐতিহাসিক স্থান ও প্রত্ননিদর্শনের মধ্যে- ঘোড়াঘাট দুর্গ, বারপাইকের গড়, বেলোয়া, পল্লরাজ, দামোদরপুর, সুরা মসজিদ, শাহ ইসমাইল গাজী (র)’র মাজার, শাহ দরিয়া বোখারী (র)’ মাজার, কাজী সদরুদ্দীন (র)’র মাজার ও বাসভবন উল্লেখযোগ্য। এগুলোর সংক্ষিপ্ত পরিচয় নিচে তুলে ধরা হলো-

 

ঘোড়াঘাট দুর্গ

           উপজেলার দক্ষিণ সীমানায় ঘোড়াঘাট ইউনিয়নের সাহেবগঞ্জ মৌজায় ঘোড়াঘাট দুর্গের অবস্থান। দুর্গের পূর্বধারঘেঁষেই প্রবাহিত করতোয়া নদী এবং পশ্চিম, দক্ষিণ ও উত্তর দিকে (লাগোয়া) পরিখা দ্বারা বেষ্টিত। সুলতানী আমলের আগে এ দুর্গের ভিত প্রতিষ্টিত হলেও মোগল আমলে এসে এ চরম উন্নতি সাধিত হয়। উত্তরবঙ্গের মধ্যে এটি একটি মাঝারী ধরণের মাটির দুর্গ ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায় অনেক গবেষকের গ্রন্থে। কানিংহামের মতে- ঘোড়াঘাট শহরের আয়তন ছিল উত্তর-দক্ষিণে ১০ মাইল ও প্রস্থে ২ মাইল। আ.কা.মো. যাকারিয়া সাহেবের বাংলাদেশ প্রত্নসম্পদ গ্রন্থের তথ্য মতে আলোচ্য দুর্গটি উত্তর-দক্ষিণে লম্বা ও পূর্ব পশ্চিম দেয়ালের দৈঘ্য অনুরূপ, উত্তর দেয়াল আধা মাইল এবং দক্ষিণ দেয়াল প্রায় এক মাইল লম্বা। ধারণা, এই সীমানা কেবল দুর্গের কেন্দ্রের। বিশেষ করে দক্ষিণ দিকে আরো প্রলম্বিত ছিল। উত্তর, দক্ষিণ ও পশ্চিম ধারে যে পরিখা দেখা যায় তা প্রায় ৬০ ফুট চওড়া। পশ্চিম দেয়ালের উত্তরাংশে দুর্গের প্রধান প্রবেশ পথ ছিল। প্রধান প্রবেশ পথ থেকে ৪০০ গজ দক্ষিণ- পূর্ব দিকে দুর্গের দ্বিতীয় আন্তদেয়ালের গুরু। এর পাশেই ছিল ফৌজদার ভবন। তাচাড়াও দুর্গবেষ্টনীর প্রধান অংশে ছিল প্রশাসনিক ভবন, সেনা ছাউনী, সামরিক কর্মচারিদের বাসভবন, মসজিদ ও মাদ্রাসা। এখন শুধু পরিক্ষার উপরে ৮/১০ ফুট উঁচু লালমাটির প্রাচীর আছে যেগুলো পথিকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। মাটির প্রাচীরের উপরে এখন আগাছা জন্মেছে।

          সম্রাট আকবরের আমলে এই দুর্গে ৯০০ আশ্বারোহী, ৫০টি হাতি ও ৩২,৬০০ পদাতিক সৈন্যের স্থান সংকুলান হতো। দুর্গের অভ্যন্তর ভাগে পশ্চিম দিকে (পাকা সড়কের ধারে) ফৌজদার ভবনের কাছাকাছি জায়গায় একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত মসজিদ, মসজিদের পশ্চিম ধারে পুরাতন জরাজীর্ণ কবর ও মসজিদের সামনে একটি ৮ কোণী ইদারা এবং দক্ষিণ পাশে লাগোয়া গোলাকার আর একটি পরিত্যাক্ত ইদারা দৃষ্টিগোচর হয়। অধূনা স্থানটি মাজারপাড়া বলে পরিচিত। জঙ্গলে ঢাকা এই স্থানটি ২০০৭ সালে পরিস্কার করা হয়। এখন দুর্গের ভূমির উপরে বৃক্ষ রোপণের কাজ চলছে।

 

(ক) মসজিদঃদুর্গনগরীর অভ্যন্তরে ধ্বংসপ্রাপ্ত সমজিদটি ঘোড়াঘাট মসজিদ বলেই পরিচিত। এর দৈর্ঘ্য ৪৬ ফুট ও প্রস্থ ২২ ফুট। কার্নিস পর্যন্ত উচ্চতা ১৪ ফুট প্রায়। সামনে ৩ দরজা, উপরে ৩ গম্বুজ। চারকোণায় ৪টি মিনার ছিল তা নষ্ট হয়ে গেছে অনেক আগেই। উত্তর দিকের গম্বুজ ও দেয়াল ভেঙ্গে পড়েছে। দেয়ালে পুরুত্ব ৪০ ইঞ্চির মতো। সমগ্র ইমারতের পলেস্টার খুলে পড়েছে। ভিতরে ৩ কাতার নামাজীর স্থান সংকুলান হতো। এক সময় এ মসজিদটি অত্যন্ত সৌন্দর্য মন্ডিত ছিল। বুকানন হেমিল্টনের দেয়া তথ্য মতে, আলোচ্য মসজিদটি নবাব আলীবর্দী খানের আমলে ১১৫৩ হিজরীতে (১৭৪০ খ্রিঃ) মোহাম্মদ সালেহের পুত্র ও মোহাম্মদ হোসেনের পুত্র জয়নাল আবেদীন মসজিদটি নির্মাণ করেন। এই জয়নাল আবেদীন ঘোড়াঘাট দুর্গের ফৌজদার ছিলেন। এখানে উল্লেখ্য দুর্গের দক্ষিণ পূর্ব দিকে আলাউদ্দিন হোসেন শাহ এর আমলে নির্মিত দ্বিতীয়আর একটি সমজিদের ধ্বংসাবশেষ চাম্পাতলী থেকে আবিস্কৃত হয়েছে। ঐ মসজিদের শিলালিপিটি বগুড়া যাদুঘরে রক্ষিত আছে বলে বাংলাদেশ প্রত্নসম্পদ গ্রন্থে উল্লেখ আছে। ধারণা, সেনানিবাসের মধ্যে থাকা আলোচ্য মসজিদটিতে ফৌজদার ও উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিরা নামাজ আদায় করতেন।

 

(খ) ইদারাঃমসজিদের সামনে ৮ কোণী (প্রায় ১২ ফুট বেড়) একটি পাকা ইদারা আছে। আবার একই মসজিদের দক্ষিণ ধারে লাগোয়া আর একটি ইদারা আছে। এটি গোলাকার। এর উপরের মুখ এখন সমতল ভূমির সমান। মুখের ব্যাস প্রায় ৬ ফুট। ধারণা, এই ইদারা দুটির পানি নামাজীদের অজুর জন্য ব্যবহার হতো। এখন পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। ভিতরে পানি নেই, প্রায় ভরাট হয়ে গেছে।

 

(গ) পাকা কবরঃউপরে বর্ণিত দ্বিতীয় ইদারার পশ্চিম পাশে পাকা সড়কের ধারে মসজিদের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে লাগানো একটি পাকা কবরের অস্তিত্ব লক্ষ্য করা যায়। বাঁধানো কবরের কিছু অংশের ইট খুলে পড়েছে। কবরটি কার তা জানা যায় না। এই কবরের আশেপাশে আরো কিছু কবরের অস্তিত্ব বিদ্যমান। তবে সেগুলো মাটির সাথে মিশে গেছে অনেক আগেই। অধূনা স্থানটি ‘মাজারপাড়া’ বলে স্থানীয়দের কাছে পরিচিত। ২০০৮ সারে স্থানটি পরিদর্শনকালে মসজিদেরপাশে একটি সাইনবোর্ডে তা লেখা রয়েছে। সেই সোথে জঙ্গলে ঢাকা সমুদয় স্থানটি পরিস্কার করা হয়েছে। ধ্বংসপ্রাপ্ত মসজিদটি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হওয়া সত্ত্বেও দেশের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কোন সাইনবোর্ড সেখানে দেয়া হয়নি। দৈনিক শত শত বাসযাত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে এই পরিত্যক্ত ও প্রাচীন নিদর্শনটি। এখানে উল্লেখ্য, এ সমাধি থেকে ১ কিঃ মিঃ পূর্ব দিকে নদীর ধারে চম্পাতলী নাম স্থানে বাঁধানো ঘাট ও উঁচু একটি ঢিবি এখানো দৃষ্টিগোচর হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা এ স্থানকে পুঁথি সাহিত্যের সাথে সংশ্লিষ্ট গাজী কালু  ও চম্পাবতীর স্মৃতি বিজড়িত নিদর্শন বলে মনে করেন।

 

শাহ ইসমাইল গাজীর মাজার

 

            উপরে বর্ণিত পাকা কবরের স্থান থেকে আনুমানিক ৪০ গজ দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে পাকা রাস্তার পশ্চিম ধারে সামান্য টিলা সদৃশ একটি জায়গা আছে। এর পশ্চিম ধারে ঢালু স্থানে পাশাপাশি দুটি সমাধি রয়েছে। সমাধি দুটির দক্ষিণ ধারে পরিখা বা ছোট পুকুরের মতো গর্তবিশেষ দেকা যায়। যাহোক, পাকিস্তানন আমলের প্রথম দিকে স্থানটি জঙ্গলে  ঢাকা ছিল। পরে স্থানীয় বাসিন্দারা জঙ্গল পরিস্কারকালে এই সমাধি দুটি দৃষ্টিগোচর হয়। দক্ষিণ দিকের  সমাধিটি শাহ ইসমাইল গাজীর বলে মাজারের খাদেমসূত্রে জানা যায়। দৈর্ঘ্য ৮ ফুট ও প্রস্থ ৫ ফুট। সমাধি দুটি ইটের প্রাচীর দ্বারা সুরক্ষিত। এরূপ জনশ্রুতি আছে বহু দিন যাবত মাজারটি জঙ্গলে ঢাকা ছিল। এই জঙ্গলের ভিতর মাজারের পাশে দিন রাত একটি বাঘ পাহারা দিতো। এ বাঘ কারো ক্ষতি করতো না। স্থানীয় লোকেরা মানতি দ্রব্যাদি নিয়ে জিয়ারতের উদ্দেশ্যে এলে বাঘটি দূরে সরে যেতো। আরো জানা যায়, এ মাজারের অসম্মান হলে বড় ধরণের ক্ষতি বা দুঘটনা ঘটতো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় গোবিন্দগঞ্জের বাগদা ফার্মের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মি.এস,কে ঘোষ কোন রকম সম্মান দেখানো ছাড়াই মাজারের পাশ দিয়ে মোটর গাড়ি চালিয়ে নিয়ে গেলে তিনি দুর্ঘটনায় পড়েন। তবে তিনি জীবনে বেঁচে গেছেন। মাজারকে অসম্মান করা হয়েছে এটা তিনি বুঝতে পেরে প্রায়শ্চিত্তস্বরূপ নিজ অর্থে মাজারটি পাকা করে দেন।১৯৯৫ সাল পর্যন্ত মি. ঘোষের বাঁধানো স্থাপত্য কাঠামোটি অটুট ছিল। তার পরে একধিকবার সংস্কার করা হয। বর্তমানে সেখানে একজন নিয়মিত খাদেম আছেন যিনি মাজারের খেদমত করে থাকেন। উক্ত মাজারে এখনো জিয়ারত ও সম্মান দেখানো হয়। অতি সম্প্রতি সেখানে একটি সুরম্য মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে।

         রিশালাতুস সুহাদা গ্রন্থ থেকে জানা যায়, এই ইসমাইল গাজী গৌড়ের সুলতান রুকনউদ্দিন বরবক শাহ এর (১৪৫৯-১৪৭৬ খ্রিঃ) প্রধান সেনাপতি ছিলেন। পার্শ্ববর্তী কামরূপ রাজ্যের অত্যাচার দমনের উদ্দেশ্যে  গৌড় থেকে শাহ ইসমাইর গাজী কিছু সৈন্য সমান্তসহ ঘোড়াঘাট এলাকায় আসেন। পথে দিানজপুরের (বর্তমান নওগাঁ) সন্তোষ নামক স্থানে কান্তেশ্বর/কামেশ্বর রাজার সাথে যুদ্ধে তিনি পরাজিত   হয়ে মাত্র ১২ জন পাইকসহ ঘোড়াঘাটের বারপাইকের গড়ে আশ্রয় গ্রহন করেন এবং ধ্যান মগ্ন হন । উপযুক্ত সুযোগের অপেক্ষা করতে লাগলেন । এর কিছু দিন পরে সুযোগ এসে গেল । উভয় পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ হলো । এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখে রাজা যুদ্ধ না করে গৌড়ের সুলতানের বশ্যতা মেনে নেন । এতে গাজীর বিজয় সূচিত হয় । কিন্তু ঘোড়াঘাট দুর্গের অধিনায়ক ভান্দুসী রায়ের চক্রান্তের কারনে সুলতানের নির্দেশে গাজীর শিরোচ্ছেদ করা হয় (১৪৭৪ খ্রি .) কাটাঁদুয়ারে । গাজীর ধড়ের একটি অংশ সমাধিস্থ করা হয় ঘোড়াঘাটে । আলোচ্য সমাধিটি সেই সেনাপতি শাহ ইসমাইল গাজীর । আগের চেয়ে মাজার ও তৎসংলগ্ন স্থানের বেশ উন্নতি হয়েছে এখন । ( বিস্তারিত দেখুন ব্যক্তিত্ব অধ্যায়ে শাহ ইসমাইল গাজী অংশে ) ।

 

বারপাইকের গড়

 

           উপজেলার সিংড়া ইউনিয়নের অন্তর্গত ঘোড়াঘাট-রানীগঞ্জ রোডের উপর বিরাহিমপুর কাচারী । কাচারীর পূর্ব ধারেই মইলা ( মরা করতোয়া ) নদী বেষ্টিত ত্রিভূজাকৃতি স্থলভাগ লক্ষ্য করা যায় । নাম বারপাইকের গড় ।  মৌজার নামও বারপাইকের গড়  , মেŠজার মোট জমি ৩৯৩.৬০ একর । ঘোড়াঘাট দুর্গ  থেকে এস্থানের দূরত্ব উত্তর-পশ্চিমে প্রায় ১০কিলোমিটার । এখানে প্রাচীনকালে একটি দুর্গ ছির তার প্রমাণ মিলে ইতিহাস থেকে । গড়ের জমির পরিমাণ ৭৬.২৭ একর। নদীর স্রোত ঘেষে  গড়ের চর্তুদিকে ৪০ ফুট প্রশস্ত ও ৮/১০ফুট উঁচু মাটির প্রাচীর আছে । বর্তমানে মাটির প্রাচীরের উঁচ্চতা আগের তুলনায় হ্রাস পেয়েছে। গড়ের  চর্তুপাশে যে নদী / পরিখা আছে তার প্রশস্ততা পূর্ব দিকে ৫০ ফুট এবং পশ্চিম ও দক্ষিন দিকে ১২০ ফুট , গভীরতার কারনে খরা মৌসুমেও পানি থাকে । স্থানটি বড় গড় ও ছোট গড় দুটি অংশে এখন বিভক্ত । গড়ের ধারে প্রাচীন সামধির পাশেই আছে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের একটি সাইনবোর্ড ।

আলোচ্য গড়টি কোন আমলে সৃষ্টি তা সঠিক ভাবে জানা যায় না । তবে গৌড়ের সুলতান রুকনউদ্দিন বরবক শাহ-এর আমলে (১৪৫৯-১৪৭৬ খ্রি.) তার সেনাপতি শাহ ইসমাইল গাজী ১২ জন পাইকস এই দুর্গে আশ্রয় গ্রহন করেছিলেন । ভাগিনেয় মুহাম্মাদ শাহের উপর দুর্গ রক্ষার ভার দিয়ে গাজী উত্তরে চতরাহাটের কাছে জলমোকাম নামক স্থানে  চলে যান । ১২ জন  পাইক থাকার  কারনে আলোচ্য দুর্গটির নাম বারপাইকের গড় হয়। তার আগে এটি কোন নামে পরিচিত ছিল জানা যায় না । ধারনা , এই গড়টি পাঠান আমলের আগে নির্মিত হয়েছিলু খুবসম্ভব কামরূপ কামতা রাজ্যের আক্রমন প্রতিহত করার লক্ষ্যে । রাজা নীলাম্বরের সময়ে দুর্গটি নির্মিত বলে কোচবিহারের ইতিহাসে ইঙ্গিত রয়েছে । কিন্তু গড়টি ঐ রাজার আমলেরও আগের বলে অনুমতি । যাহোক, মুসলিম শাসন আমলে  দুর্গটি ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারাতে থাকে । এর পরিবর্তে ঘোড়াঘাট দুর্গ প্রাধান্য লাভ করে । ক্রমে স্থানটি জঙ্গলকীর্ণ ও দুর্গম হয়ে পড়ে । পাকিস্তান আমলে স্থানীয় সাঁওতাল ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের লোকেরা জঙ্গল পরিষ্কার করে আবাদযোগ্য করে তোলে । বিরাহিমপুর থেকে গড়ে পারাপারের জন্য একটি বাঁশের সাঁকো  আছে  । দিনাজপুর জেলার গেজেটীয়ার ( ১৯৯১ সনে মুদ্রিত ) থেকে আরো জানা যায় , প্রাচীনকালে গড়ের ভিতরে একটি অট্ট্রালিকা ছিল , বৃটিশ আমলেও তার সামান্য অস্তিত্ব ছিল ।  এখন সামান্য উঁচু মাটির ঢিবি দৃষ্টিগোচর হয় । সরেজমিনে বাস্তবাবস্থা দৃষ্টে নিশ্চিতভাবে বলা যায় , অতীতে  এটা একটা সুরক্ষিত দুর্গ ছিল । গড়ের পূর্ব ধারে একজন মুসলমান পীরের মাজার আছে । সেটি দেওয়ান পীরের মাজার বা অচীন পীরের মাজার বলে স্থানীয়রা জানেন । তিনি কোথাকার লোক এবং কী তার পরিচয় সে সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায়না। স্থানীয মুসলমান হিন্দু বাসিন্দারা এ মাজারকে যথেষ্ট ইজ্জত করে এবং সিন্নী মানত করে থাকে । এই গড়কে কেন্দ্র করে নানা জনশ্রুতি স্থানীয়ভাবে প্রচার লাভ করেছে ।

                                                                

 

বেলোয়ার প্রাচীন কীর্তি

 

         উপজেলার পশ্চিম দিকে পালশা ইউনিয়নের অন্তগর্ত দীঘি-পুকুর সমৃদ্ধ বেলেয়া একটি প্রাচীন গ্রাম । মৌজার মোট জমির পরিমাণ ১৩৫৫.৪৮ একর । জনশ্রুতি আছে, এই গ্রামে বেহুলার পিতা বাসো বানিয়ার বাড়ি ছিল । বেহুলারা ছিল সাত বোন । তারা সাতটি দীঘিতে গোসল করতো ।  তাই তাদের পিতা সাত বোনের জন্য পৃথক সাতটি দীঘি খনন করে দেন । দীঘিগুলোর নামও বেশ চমৎকার । যেমন- নয়ন দীঘি, মন্ডলের দীঘি, বামন দীঘি, আন্ধোয়া দীঘি, কোদাল ধোয়া দীঘি ও ছয়ঘাটি প্রভূতি ।  আলোচ্য গ্রামে সাতটি দীঘি ছাড়া   ও প্রায় ৪০ টি অধিক ছোট বড় দীঘির অস্তিত্ব আছে । এইসব দৃষ্টে ধারনা করা যায়, প্রাচীনকালে এখানে একটি জনপদ ছিল যা মহাকালের করাল গ্রাসে ধ্বংস হয়ে গেছে । এখানে একটি দুর্গ ছিল এমন বর্ণনাও পাওয়া যায় কোন কোন লেখকের লেখায় । উল্লেখ্য, বর্তমানে প্রত্যেকটি দীঘির উঁচু পাড়ে সাঁওতাল ও স্থানীয় বাসিন্দাদের বসত গড়ে উঠতে শুরু করেছে ।

(ক) নয়ন দীঘি:বেলোয়ার সবচেয়ে বড়  দীঘির নাম নয়নদীঘি । এটি উত্তর-দক্ষিণে ৭০০ গজ দৈর্ঘ্য ও পূর্ব-পশ্চিমে ৪০০ গজ প্রস্থ । পাড় বেশ উঁচু । বিশাল এ দীঘিতে সারা বছর পানি থাকে । এই  দীঘি থেকে পাকিস্তান আমলে (১৯৭১ সালের আগে ) বড় একটি পাথরের মূর্তি পাওয়া গিয়েছিল । সেটি এখন কোথায় আছে তা জানা যায় না ।  এই দীঘির পূর্ব ধারে লাগোয়া আরো ৩/৪ টি ছোট ছোট দীঘি আছে । এখন মন্ডলের দীঘিটিই দৃষ্টিগোচর হয় ।উভয় দীঘির মাঝের উচুুুুঁ ভূমির উপর দিয়ে গ্রাম্যপথ রচিত হয়েছে।

(খ)আন্ধেয়া দীঘি: নয়ন দীঘি থেকে সোজা ১ সাইল পূর্ব দিকে বামন দীঘি অবস্থিত। এই দীঘির দক্ষিণে প্রায় পাশাপাশি অবস্থিত ৩টি দীঘির মধ্যে একটি মাঝারী ধরনের দীঘি আছে-নাম আন্ধেয়া ধীঘি। এর আয়তন ২৫০´১৫০ গজ। এতেও সারা বছর পানি থাকে । পাড় উঁচু-পাড়ে নতুন বসত গড়ে উঠতে শুরু করেছে।

(গ) বামন দীঘি:আন্ধেয়া দীঘির উত্তর পশ্চিম  কোণে খনিত বড়  দীঘিটির নাম বামন  দীঘি । এর আয়তন ৬০০´৩০০ গহজ । এর পাড়গুলো ১৫ ফুট উঁচু্ । এখন অনেকটা হ্রাস পেয়েছে। জেলা পরিষদের রাস্তা থেকে  এই দীঘির উত্তর অংশের পার দেখা যায়। এই দীঘির ১০০ গজ দক্ষিণে ঢোলচৌধুরীর দীঘির কাছাকাছি স্থানে একটি বেশ আয়তাকার উঁচু ভূমি আছে। এর অভ্যন্তরে প্রাচীন অট্রা্লিকার ধ্বংসাবশেষ বিদ্যমান । ১৯৪৬ সালে বামনদীঘির দক্ষিণ পাড়ের পশ্চিম অংশে খাড়ে সাঁওতাল বাড়ির উঠোন থেকে চুলা খননের সময় দের ফুট মাটির গভীরে পাল আমলের ২টি তাম্রালিপি আবিস্কার হয় । এ তাম্রলিপিগুলো  খারে সাঁওতাল পেলেও পরে তা সরকারি লোকের মাধ্যমে বগুড়া জাদুঘরে জমাদেয়া হয় সংরক্ষণের জন্য।

(ঘ) ছয়ঘাটি দীঘি: আন্ধেয়া দীঘির দক্ষিণ-পশ্চিমের বড় দীঘিটি ছয়ঘাটি দীঘি নামে খ্যাত । এর আয়তন ৬৫০´৩৫০ গজ । এর পাড়গুলো প্রায় ২০ফুট উঁচু । এখন অনেকটা কমে গেছে । দীঘির পূূর্ব পাড়ে ২টি, পশ্চিম পাড়ে ২টি এবং উত্তর পাড়ে ১টি ও দক্ষিণ পাড়ে ১টি মোট ৬টি বাঁধান ঘাট আছে। ছয়ঘাট থাকায় এর নাম ছয়ঘাটি হয়েছে। বেহুলা এই দীঘিতে স্নান করতেন বলে জনশ্রুতি আছে। এই দীঘির উত্তর পারে একটি স্বল্প আয়তন বিশিষ্ট সামান্য উঁচু ভূমি আছে । স্থানটিতে ধ্বংসপ্রাপ্ত একটি অট্রা্লিকার অস্তিত্ব ছিল বলে জানা যায় । মেজর শেরউলের মান চিত্রে স্থানটি পানিপীরের (পাঁচপীরের) আস্তানা বা দরগা বলে বর্ণিত হয়েছে । পার্শ্ববর্তী ভাতশালা গ্রামের বশির সরকার এখান থেকে পাকিস্থান আমলের শেষ দিকে ২ ফুটের সামান্য লম্বা একটি পিতলের আসা পেয়েছিলেন। তাতে পাঁচ জন বরহিনা সম্প্রদায়ের ফকিরের নাম খোদিত ছিল। বশির সরকারের ছোট ভায়ের নিকট থেকে দিনাজপুরের তৎকালীন ডিসি মহোদয় জনাব আ. কা. মো. জাকারিয়া জাকারিয়া সাহেব আসাটি নিয়ে দিনাজপুর যাদুঘরে সংরক্ষনের জন্য জমা দেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় সেটি হারিয়ে গেছে বলে তিনি তার গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।         

 

পল্লরাজ

       পাল ও রাজ দুটি শব্দের মিলনে পল্লরাজ শব্দ। ঘোড়াঘাট উপজেলার সিংড়া ইউনিয়নের একটি প্রাচীন স্থান। ঘোড়াঘাট দূর্গ থেকে এ স্থানটি প্রায় ৫ কি মি উত্তর পশ্চিম দিকে এবং বেলোয়া থেকে ৩ কি মি পূর্ব দিকে অবস্থিথ। প্রায় ৪ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুলে পুকর, ঢিবি ও জঙ্গলে পরিপূর্ণ এক প্রাচীন স্থান।  বাংলাদেশ প্রত্মসম্পদ সন্থ থেকে জানা যায় পাল বংশের প্রথম নৃপতি গোপাল গৌড়ের সিংহাসন অধিকারের পূর্বে ছোট সামন্ত রাজা হিসেবে এখানে তার জয়স্কন্দাবার বা রাজধানী গড়ে তুলেছির। এখান থেকেই শক্তি সঞ্চয় করে তিগগৌড়অধিপতি হয়েছিলেন বলে প্রবল জনশ্রুতি আছে।১০

 

দামোদর পুর

 

        বুলাকীপুর ইউনিয়নের একটি গ্রাম ও প্রাচীন জনপদ দামোদরপুর। মৌজার মোট জমির রিমাণ ৫২৩.৩৬ একর।১১রানীগঞ্জ থেকে ভাদুরিযা গামী রাস্তার কানাগাড়ী বাজারের দক্ষিণ পশ্চিম দিকে এবং বেলোয়ার প্রাচীন কীর্তিবাহী স্থান থেকে দেড় কিলোমিটার উত্তর পশ্চিমে দামোদরপুর অবস্থিত। বেশ কয়েকটি প্রাচীন জলাশয় ও ৪/৫ টি মাটির ঢিবি আছে এখানে। অনেক গবেষক এ স্থানটিকে দামোদরপর নামেই চিহ্নিত করেছে।

সুরা মসজিদ

ঘোড়াঘাট ইউনিয়নের চৌগাছা মৌজায় (হিলি রোড) প্রাচীন এ মসজিদটি অবস্থিত। ঘোড়াঘাট উপজেলা কেন্দ্র থেকে ৩ কিলোমিটার পশ্চিমে গেলে পাকা রাস্তার উত্তর ধারে ৩৫০-২০০ গজ আয়তন বিশিষ্ট বিশাল একটি পাড়ওয়ালা দীঘির দক্ষিণ ধারে আলোচ্য মসজিদটি অবস্থিত। মসজিদটি জনহীন এক জনপদের নীরব সাক্ষী। এর নাম নিয়ে আছে নানা কথা কেউ বলেন সৌর মসজিদ , কেউ বলেন সুরা মসজিদ , আবার কেউ বলে শাহ সুজা মসজিদ। সুর শব্দের অর্থ অপদেবতা বা জ্বীন। স্থানীয় মুরুববীরা জানান, এক রাতের মধ্যে জ্বীনেরা এটি নির্মাণ করে দেন, তাই এর নাম সুরা মসজিদ হয়েছে। সৌর শব্দের অর্থ আসমানী  বা গায়েবী অর্থাৎ লোকচক্ষুর আড়ালে যা ঘটে বা হয় তাই গায়েবী। অর্থাৎ গায়েবী ভাবেই মসজিদটি নির্মীত হয়েছে। আবার অনেকে বলেন- মোগল আমলে বাংলার নবাব সুজা এটি নির্মাণ করে দেন বলে এর নাম শাহ সুজা মসজিদ হয়েছে। এমন ধরণের আরো অনেক কথা লোকমুখে শোনা যায়। বাস্তবে শাহ সুজার ক্ষমতা গ্রহণের অনেক আগে এ মসজিদটি নির্মিত হয়েছে। মসজিদের নামকরণ ও নির্মাণ সংক্রান্ত বিষয়ে উপরে উল্লেখিত কোন তথ্য সঠিক বলে মেনে নেয়া যায় না। কারণ , যে ক্ষেত্রে মসজিদের শিলালিপি বা প্রমাণ পাওয়া যায় সে ক্ষেত্রে নির্মাণশৈলী বা স্থাপত্য কাঠামো নির্মাণকাল নির্ধারণে একটি অনুসঙ্গ বলে বিবেচিত হয়। এ ক্ষেত্রে আলোচ্য মসজিদের শিলালিপি নেই। তাই গঠনশৈলীর উপর ভিত্তি করেই সম্ভাব্য নির্মাণকাল বের করা যায়। আলোচ্য মসজিদটির বাইরের দিকের আয়তন উত্তর-দক্ষিণে ৪০ ফুট এবং পূর্ব পশ্চিমে ২৬ ফুট। চার ফুট উচু মজবুত প্লাটফর্মের উপর মসজিরদর কাঠামো গড়ে উঠেছে।  প্রধান কক্ষের আয়তন ভিতরে ১৬´১৬ ফুট। প্রধান কক্ষের সাথে যুক্ত আছে ৬ ফুট প্রশস্ত রাস্তা। মসজিদের বাইরের দিবে দেয়ালে গায়ে ছোট ছোট খোপকাটা টেরাকোটা অলংকরণ ইমারতের বাহ্যিক সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে। এছাড়াও লতাজাতীয়াভিনব নকশায় বাইরের দেয়াল সুসজ্জিত যা মানুষের দৃষ্টি আকর্ষন করে।  ইতিহাসবিদ অধ্যাপক দানী এটিকে গৌড়ের সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ এর আমলে নির্মিত বলে অনুমান করেন। ১২আলোচ্য এই মসজিদটি সুলতানী আমলে ( ১৪৯৩-১৫১৮) খ্রিষ্ঠাব্দে নির্মিত বলে ধারণা করা হয়। ১৩

 

 

কাজী সদরুদ্দিন (রহ)’র বাস ভবন, সমাধি ও সমজিদ

 

ঘোড়াঘাট থানা ভবন থেকে ২ কিলোমিটার উত্তর দিকে শহরগাছী মৌজা। মৌজার মোট জমি ১৭৩ একর। ১৯৭৪ সালে লোকসংখ্যা ছিল মাত্র ৩৪৫ জন। সেখানে বেশ কয়েক ঘর আদিবাসী সাঁওতালের বসত আছে। থানা ভবনের পাশ দিয়ে একটি সরু পাকা রাস্তা এঁকেবেঁকে চলে গেছে উত্তরে দিকে । ঝোপঝাড় পার হয়ে একটু উত্তরে গেলেই ঘোড়াঘাটের বিখ্যাত পীর ও কাজী সদরুদ্দিন সাহেরে মাজার এলাকা।  প্রথমেই দেখা যাবে কাজী সদরুদ্দিনের (রহঃ) এর ১২ দুয়ারী প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ। তার উত্তরে আছে (৩৫ গজ দুরে) সমাধিস্থ এবং সমাধির উত্তর ধারে আছে মোঘল আমলে নির্মিত সৌন্দর্যমন্ডিত একটি মসজিদের ধ্বংসাবশেষ। এই স্থানের উত্তর-পূর্ব দিকে আনুমানিক ১০০ গজ দূর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে করতোয়া নদী। কাজী সাহেবের বাসভবনের পূর্ব পাশে দু-এক ঘর সাঁওতালের বসত আছে। তারা অনেক দিন ধরে এখানে বাস করছেন। বলতে গেলে অনেকটা জনমানবহীন এই স্থানে একা এলে গা শিউরে উঠবে। অথচ এক সময় এই স্থান ছিল কোট- কাচারীর মতো সরগরম।

(ক) ১২ দুয়ারী প্রসাদঃবারদুয়ারী বাস স্থান থেকে ৩০ গজ উত্তর দিকে কাজী সাহেবের মাজার। সামনের দিকে প্রবেশ পথ, তাতে আছে কাঁটাতারের বেড়া, কোথাও কোথাও অনুচ্চ প্রাচীর আছে। জনমানবহীন জায়গা। এখানে এক এলে ভয় লাগে। অনেক গুলো লম্বা লম্বা সমাধি মাজারের পূর্বধারে রয়েছে। সমাধিগুলো কার সে সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না। এই মাজারে একজন বয়োবৃদ্ধ খাদেম আছেন। তিনি জানান, এই কবরগুলো মাজারের খাদেমদের। দীর্ঘ দিন মাজারের খেদমত করে যে যখন মারা গেছেন তখন তার সমাধি এখানেই দেয়া হয়েছে।

 

দেওয়ান গাজীর মাজার

সিংগা ইউনিয়নের অন্তর্গত বিরাহিমপুর কাচারীর ৫০ গজ পূর্ব- উত্তর দিকে এবং বার পাইকেরগড়ের পশ্চিমে মইলা নদীর তীরে বটগাছের নিচে একজন গরীবের মাজার আছে। এটি দেওয়ান গাজীর মাজার বলে খ্যাত। আগে এখানে প্রাচীন ইটের স্ত্তপ ছিল। পাকিস্তান আমলে এই স্ত্তপ পরিস্কার কালে এখানে একটি মাজারের অস্তিত্ব আবিস্কার হয়। শাহ ইসমাইল গাজীর কোন অনুচরের মাজার হতে পারে বলে ধারণা করা হয়। কারণ ইসমাইল গাজী ১২ জন পাইক সমেত এখানকার পার্শ্ববতী গড়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাদেরই একজনের মাজার বলে অনুমিত। হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের লোকের কাছেই এ মাজার একটি পূন্যভূমি। একই ইউনিয়নের রাণীগঞ্জ বাজারের পশ্চিম ধারে একজন পীর সাহেবের সমাধি আছে। তার নাম পীর সাহেব আব্দুল কাদের।

 

পাঁচ পীরের দরগাহ

 

উপজেলার পালশা ইউনিয়নের অন্তর্গত প্রাচীন দীঘিপুকুর ও আদিবাসী সমৃদ্ধ গ্রাম বেলোয়া। এখানকার ছয়ঘাটি দীঘির উত্তর ধারে দুই বিঘার মতো উচু একটি স্থানে পাঁচটি সমাধির মতো স্থান পরিলক্ষিত হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এটি পাঁচ পীরের দরগা বা মাজার। মেজর শের ইউলর মানচিত্রে স্থানটি ‘‘ পানি পীর সাহেবকি পুকুর’’ নামে উল্লেখ করা হয়েছে। মুলত এটি পাঁচ পীরের পুকুর। এখানকার ভাতছালা গ্রামের বশির সরকার এখান থেকে পিতলের একটি আসা পান বলে বাংলাদেশ প্রত্নসম্পদ গ্রন্থে উল্লেখ আছে। উক্ত আসার মাথা তিনটি ভাগে বিভক্ত ছিল। মধ্যভাগে বাঘের মাথার ছবি এবং অন্য দুই ভাগে মাছের প্রতিকৃতি অংকিত ছিল। মধ্যভাগে কালেমা তৈয়বা, মোহাম্মাদ মোস্তফা (স) এর পাক আমেলের শেষের দিকে দিনাজপুরের ডিসি মহোদয় সংগ্রহ করে দিনাজপুর মিউজিয়ামের সংরক্ষণের জন্য জমা দেন। কিন্তু ১৯৭১ সারে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সেখান থেকে আসাটি হারিয়ে যায়।

 

মাওলানা নুর উদ্দিন (রহ)’র মাজার

ঘোড়াঘাট- কামদিয়া রাস্তার পাশে সাবেক মহুয়ার বাগ নামক স্থানে পাকা রাস্তার পাশে মাজারটি অবস্থি। মাজার কেন্দ্রিক সাবেক স্থাপন অনেক আগেই ধ্বংস হয়ে গেছে। কালে কটাক্ষ উপেক্ষা করে কেবল মাজারটি টিকে আছে। এমন কি মাজারের ঘরটিও নষ্ট হয়ে গেছে। জানা যায় মওলানা নূরউদ্দিন ঘোড়াঘাটে সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এবং এখানেই তিনি লেখাপড়া শিখে ইসলাম প্রচার ও শিক্ষা বিস্তারে মনোযোগী হন। তিনি এখাধারে শিক্ষাবিদ, সাধক শাস্ত্রজ্ঞ আলেম ও ইসলাম প্রচারক ছিলেন। আরো জানা যায়, তিনি অসাধারণ বাগ্মী ছিলেন। তার ওয়াজ শোনার জন্য সভাস্থরে দলে দলে লোকজন আগমন করতো। তার ওঢাত সাভের পরে এখানে তাকে সমাধিস্থ করা হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে তার কাম্যত সর্ম্পকে এখনো অনেকে কথা শোনা যায়। আপদ বিপদে আত্বানা লাভ ও রুহানা ফায়েজ হাসিলের উদ্দ্যেশ্যে অনেক লোক মাজার জিয়ারত আগমন করেন।

 

খন্দকার বদরে আরেফিন (রহঃ) র মাজার

 

ঘোড়াঘাট বাজারের কেন্দ্রস্থল থা্না ভবনের পূর্ব দিকে মসজিদের পাশে মাজারটি অবস্থিত। তিনি ঘোড়াঘাটেই জন্ম গ্রহন করেন। এখানেই শিক্ষা লাভ করেন বলে জানা যায়। তার পিতৃ পরিচয় জানা না গেলেও তিনি একজন নামকরা আলেম, পীর, উন্নত ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মানুষ, নীতিবান, শিক্ষাগুরুরুপে সমাজে পরিচিতি ও শ্রদ্ধার পাএ ছিলেন। তার নিজস্ব বাসভবনে আশে পাশে সে সময় গড়ে উঠেছিল মসজিদ, মাদ্রাসা ও খানকাহ। তার ওফাত লাভের পরে এখানেই তাকে সমাহিত করা হয়। সমাধিটি ৭ ফুট লম্বা ও ৪ ফুট প্রস্থ। সমাধির পশ্চিম পাশেই কয়েক খন্ড কালো পাথর পড়ে আছে। এখনো তার মাজারে প্রতিদিন জিয়ারত হয়। মাজারের পাশেই রয়েছে আধুনিক সুরম্য একটি মসজিদ। তাকে স্মরনীয় করে রাখার লক্ষ্যে ‘বদরে আরেফিন, নামে ঘোড়াঘাট একটি ফিলিং স্টেশনের নামকরণ করা হয়েছে।

দেওয়ান পীরের মাজার

উপজেলার পশ্চিম দিকে পালশা ইউনিয়নের অর্ন্তগত ডুগডুগী মোকাম নামক বাজারে দেওয়ান পীর সাহেবের মাজার অবস্থিত। এ মাজারে সমাহত ব্যক্তির আগমন সর্ম্পকে বিশেষ কিছু জানা যায় না। তবে স্থানীয় বাসিন্দারা এ মাজারকে যথেষ্ট মান্য করেন। প্রকৃত নাম অজ্ঞাত। সাধারনের মাঝে দেওয়ান পীর বলেই  পরিচিত।

 

শাহ দরিয়া বোখারী (রহ.)র মাজার

ঘোড়াঘাট করতোয়া নদীর ত্রিমোহনী ঘাটের পশ্চিম ধারে চৌখন্ডি মৌজার প্রাচীযন ঈদগাহ মাঠের অভ্যন্তরে প্রায় ৩০ টির মতো সমাধি আছে। সমাধিগুলোর একটি শাহ দরিয়া বোখারীর মাজার। ঘোড়াঘাট চারমাথা বাসস্ট্যান্ড থেকে পূর্ব দিকে পাকা রাস্তার শেষ প্রান্তে গিয়ে উত্তর দিকে তাকালে বাঁশঝাড়ের কিনারে প্রাচীন ঈদগাহ মাঠের অবস্থান। ঈদগাহ মাঠের চর্তুপাশ পাকা প্রাচীর আছে। দক্ষিণ দিকে আছে প্রধান  ফটক। তাতে লেখা আছে দরিয়া বোখারী (রহ,) র মাজার। দরিয়া বোখারীর প্রকৃত পরিচয় জানা যায় না। তিনি শাহ সুজার আমলে প্রথম দিকে বোখারা থেকে ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্য নিয়ে এখানে আগমণ করেন বলে জনশ্রুতি আছে। তিনি এখানে একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এ মাদ্রাসায় তিন শতাধিক ছাত্রে আবাসিক সুবিধা ছিল। মধ্যযুগের ঘোড়াঘাট সরকার এর বিখ্যাত সাধক কবি হেয়াত মামুদের ১৭৫৮ সালে রচিত ‘আম্বিয়া বাণী’ পুঁথিতে শাহ দরিয়া বোখারী (রহ) এর বন্দনার উল্লেখ পাওয়া যায়।

 

ঋষিঘাট মন্দির

         হিন্দু ধর্মালম্বীদের জন্য প্রাচীন কাল থেকেই আধুনিক কাল পর্যন্ত তীর্থস্থান হিসেবে পরিচিত এই মন্দির। সিংড়া ইউনিযনের বিরাহিমপুর বাজারের একটু দক্ষিণ এসে পূর্ব দিকে আঁকাবাঁকা পথে যেতে হয় ঋষিঘাটে। করতোয়া নদীর তীরে ঋষিঘাট মৌজায় মন্দিরটি অবস্থিত বলে এর নাম ঋষিঘাট মন্দির হয়েছে। কোন ঋষি এই ঘাট দিয়ে পার হয়েছিলেন তার নাম অজ্ঞাত। অতীতে এখানে দুটি মন্দির নির্মান করে দিয়েছিলেন একজন ভূস্বামী। সাবেক মন্দির অনেক আগেই ভেঙ্গে গেছে। এখন চূড়াওয়ালা প্রদক্ষিণ পথ যুক্ত চারকোণী পাকা মন্দির তোলা হয়েছে। জ্যৈষ্ঠ মাসের ১০মী তিথিতে এখানে বারুনী স্নান হয়। এ উপলক্ষ্যে মেলা বসে। হিন্দু নর-নারীদের বেশ সমাগম হয় এখানে।